বিগত ৭৯ বছর যাবৎ দৃঢ়চিওে রাজশাহী শহরের বুকে দাড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল।

রাজশাহী শহরের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য ঢোপকল। ঢোপকলের সঙ্গে রাজশাহীর সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত।

সিমেন্ট, কাস্ট আয়রণ  এবং পিতলে তৈরি পানি সরবরাহ প্রকল্প মহারাণী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস নির্মিত হয় যার অন্যতম নিদর্শন রাজশাহী শহরে অবস্থিত এই ঢোপকলসমূহ। ১৯৩৭ সালের আগষ্ট মাসে মিনিষ্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে রাজশাহী ওয়াটার ওয়াকর্স নামে পানি সরবরাহ ও বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এবং ব্যায় করা হয় প্রায় আড়াই লক্ষাধিক টাকা। এই কাজে মহারাণী হেমন্তকুমারী দান করেন প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। পরবর্তীতে হেমন্তকুমারী ঢোপকল নামেই পরিচিত হয় এই ওয়াটার ওয়ার্কস।

এই ঢোপকল তৈরীর সময়ে রাজশাহী পৌরসভার (বর্তমানে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন রায় ডি এন দাশগুপ্ত।

সে সময় রাজশাহী শহরে পানযোগ্য পানি পাওয়া খুব কষ্টসাধ্য ছিল। বিশুদ্ধ পানির অভাব ঘটেছিল ব্যাপকভাবে। যার ফলশ্রুতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল কলেরা-আমাশয় সহ নানারকম পেটের পীড়া। কিছু সংখ্যক লোকের মৃত্যুর কারণ হয় এই পীড়া। 

রায় ডিএন দাশগুপ্ত রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান (১৯৩৪-৩৯) থাকাকালে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় নগরবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় রাস্তার মোড়ে মোড়ে পানির কল স্থাপন করা হবে।

পুরো শহর জুড়ে প্রায় শতাধিক এমন ঢোপকল স্থাপন করা হয় সেই সময়। মহারাণী হেমন্তকুমারী পানি শোধন কেন্দ্রে পানিকে বিভিন্ন ভাবে পরিশুদ্ধ করা হতো। সর্বপ্রথমে পাথরকুঁচির ফিল্টার দ্বাব়া পানি পরিশুদ্ধ করা হতো, পানি থেকে আয়রন ও পানির ক্ষারতা দুর করা হতো, তারপর সেই পরিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হতো ঢোপগুলোতে। ঢোপগুলো থেকে সেই পানি সিমেন্টের তৈরী মোটা পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো।

এই ঢোপকলগুলোর প্রতিটির পানি ধারণক্ষমতা ছিল ৪৭০ গ্যালন। প্রতিটি ঢোপকলেই ছিল একটি করে ‘রাফিং ফিল্টার’। ঢোপকলগুলোতে বালি ও পাথরের স্তর থাকায় সরবরাহ করা পানি আরও পরিশোধিত হয়ে বের হতো এবং গরমের সময় পানি মোটামুটি ঠান্ডাই থাকতো। সেই সময় সারাদিনে মাত্র দুই ঘণ্টা পানি সরবরাহ করা হতো। মোড়ে মোড়ে ঢোপকলগুলোতে পানি ধরে রাখা হতো, ফলে সারাদিনই স্বাচ্ছন্দে পানি পাওয়া যেত।

বর্তমানে এই ঢোপগুলো আমাদের দৈনন্দিন চাহিদা পুরনে অক্ষম হলেও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য স্বাচ্ছন্দে দাড়িয়ে আছে রাজশাহী শহরের বিভিন্ন মোড়ে। কিছু কিছু এলাকাই ঢোপগুলোকে রঙ্গে রঙ্গিত করে নতুন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে আমাদের এই প্রাচীন সংস্কৃতি।

Advertisements